Select language to read news in your own language


Like SatSakal Facebook Page to stay updated.

একটি কবিতার শতবর্ষ পেরিয়ে

পাঠক মিত্র



       
একটা কবিতা একশো তিন বছর আগে বিদ্রোহের আগুন জ্বালিয়ে ছিল এই বাংলায় । সেই আগুন বাংলার মানুষকে জাগিয়ে তুলেছিল । মাথা উঁচু করে বীরের মত বাঁচার স্বপ্ন দেখিয়েছিল । এমন একটি কবিতার জন্য একটি পত্রিকা সংখ্যার পুনর্মুদ্রণ করতে হয়েছিল । শুধু সেই পত্রিকার পুনর্মুদ্রণ হয়নি । সেই পত্রিকা থেকে অন্যান্য পত্রিকায় পরপর তার পুনর্মুদ্রণ হয়েছিল । 'বিজলী' নামক এই পত্রিকা এক সপ্তাহে পুনর্মুদ্রণ সহ উনত্রিশ হাজার কপি বিক্রি হয়েছিল তখন । তারপর 'মোসলেম ভারত', 'প্রবাসী' পত্রিকায় তার প্রকাশ ঘটে । একটা কবিতার জন্য পত্রিকার এই চাহিদা মনে হয় একশো বছর সাহিত্যের ইতিহাসে এক বিরল ঘটনা । অথচ অনেক সাহিত্য অনুরাগী মানুষ সেই কবিতাকে তখন কাব্যের মর্যাদা দিতে চায়নি । বরং তার বিরোধিতা করে সেই কবিতাকে ব্যঙ্গ করে কবিতাও লিখেছিল এক গোষ্ঠী । গোষ্ঠী শুধু রাজনৈতিকভাবে গড়ে ওঠে না যা এখনকার প্রতিটি ক্ষেত্রে চোখে পড়ে, কিন্তু সাহিত্যের আঙিনায় গোষ্ঠী একশো বছর আগেও ছিল । 
যে কবিতা নিয়ে এত কথা সেই কবিতাটি হল 'বিদ্রোহী' । এই কবিতার নামেই কবিকে চিনে নিল সবাই । হাবিলদার কবি হয়ে উঠলেন বিদ্রোহী কবি । কবি নজরুল ইসলাম । প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর বেঙ্গলি রেজিমেন্ট তুলে দিল ব্রিটিশরা । বাংলার তরুণদের দেশপ্রেমের জোয়ারে এই রেজিমেন্টে বিদ্রোহের বিপদ থেকে বাঁচতে ব্রিটিশরা ভেঙে দিল ঊনপঞ্চাশ নম্বর বেঙ্গল রেজিমেন্ট । রেজিমেন্টে থাকাকালীন তাঁর লেখা নানা পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হতে তিনি সাহিত্য জগতে পরিচিত হয়ে উঠেছিলেন । যুদ্ধ ফেরত হাবিলদার কবি প্রথমে উঠলেন রমাকান্ত স্ট্রিটে কাশিমবাজার মহারাজার পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের বোর্ডিং হাউসে । বাল্য বন্ধু শৈলজানন্দের ব্যবস্থাপনায় । তখন ওই ইন্সটিটিউটে হস্টেলে থেকে পড়াশোনা করছেন শৈলজানন্দ । তারপর 32 নং, কলেজস্ট্রিটে বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতির অফিসে । এপ্রিল, 1920 । এরপর একবছর বাসা বদল হয়েছে কয়েকবার । অবশেষে 1921 সালের জুলাইয়ে উঠলেন 3/4, তালতলা লেনের এক বাড়িতে । সঙ্গী মুজফ্ফর আহমেদ । ভারতীয় কম্যুনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাতা ও প্রাণপুরুষ । যিনি কাকাবাবু নামে কম্যুনিস্ট পার্টি কর্মী ও নেতাদের কাছে পরিচিত । আহমেদ সাহেবের সাথে তালতলার বাড়িতে থাকাকালীন 1921 সালের ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে কবি লিখলেন তাঁর বিখ্যাত কবিতা 'বিদ্রোহী' । তখন অসহযোগ আন্দোলন সফলতার পথে এগিয়ে চলছে । তখন সেই কবিতা বিদ্যুতগতিতে ছড়িয়ে পড়ল বাংলার সর্বত্র । এ বিদ্রোহ অত্যাচারের বিরুদ্ধে । এ বিদ্রোহ অন্যায়ের বিরুদ্ধে, যা-কিছু মিথ্যা, পুরাতন, কলুষিত তার বিরুদ্ধে । যা-কিছু ভণ্ডামি আর কুসংস্কারের বিরুদ্ধে । তিনি বললেন, "আমি দুর্বার/আমি ভেঙে করি সব চুরমার ।/ আমি অনিয়ম উচ্ছৃঙ্খল/আমি দলে যাই যত বন্ধন,/যত নিয়ম কানুন শৃঙ্খল ।" সমস্ত শৃঙ্খল ভাঙতে সেই পারবে যে বীরের মত মাথা উঁচু করে চলতে পারবে । এমন চলা জেগে ঘুমিয়ে থাকলে হবে না । তাই তিনি প্রথমেই বলে উঠলেন, "বল বীর-/ বল উন্নত মম শির !/ শির নেহারি আমারি,/নত-শির ওই শিখর হিমাদ্রির !"   
কবিতাটি লেখার পর কবি প্রথম শুনিয়েছিলেন আহমেদ সাহেবকে । তাঁকে মুগ্ধ করতে পারেনি এই কবিতা । তা তিনি নিজেই স্বীকার করেছেন । তাঁর স্মৃতিকথায় বলেছেন, " বিদ্রোহী কবিতার আমিই প্রথম শ্রোতা ।...নজরুল তার জীবনের শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি আমাকেই প্রথম পড়ে শোনাল, অথচ আমার স্বভাবের দোষে না পারলাম তাকে আমি কোনো বাহবা দিতে, না পারলাম এতটুকুও উচ্ছ্বসিত হতে । কি যে কথা আমি উচ্চারণ করেছিলাম তা এখন আমার মনেও পড়ছে না ।" এই কবিতার দ্বিতীয় শ্রোতা 'মোসলেম ভারত' পত্রিকার আফজাজুল হক । আর তৃতীয় শ্রোতা অবিনাশচন্দ্র ভট্টাচার্য, যিনি বোমার মামলায় বিপ্লবী বারীন ঘোষের সহবন্দী ছিলেন । এই দুই শ্রোতাই 'বিদ্রোহী' কবিতায় মুগ্ধ এবং উচ্ছ্বসিত । তাঁরা দুজনেই কবিতার কপি নিয়েছিলেন পত্রিকায় ছাপানোর জন্য । 'মোসলেম ভারত' পত্রিকায় ছাপার আগেই 'বিজলী' পত্রিকায় ছাপার ব্যবস্থা করলেন অবিনাশবাবু । প্রথম প্রকাশিত হল 6 ই জানুয়ারি, 1922 (22শে পৌষ, 1328) । এই কবিতা সমাজের সমস্ত আচ্ছন্নকে যেন দূর করে দিতে লাগল । যৌবনকে আরো গতিময় করে তুলল । বাংলাজুড়ে তরুণ সমাজ টগবগ করে ফুটে উঠল । এ সম্পর্কে তদানীন্তন সময়ের বিশিষ্ট সাহিত্য অনুরাগী ও সাংবাদিক পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায় তাঁর স্মৃতিকথায় বলেছেন, " 'বিদ্রোহী' কবিতাটি প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে নজরুলের খ্যাতিতে বাঙালি সমাজ টগবগ করে ফুটে উঠল । তরুণ সমাজ তো 'বিদ্রোহী'র ভাষায় বাক্যালাপ শুরু করে দিল । সকলের মধ্যে সেই মনোভাব--'আপনারে ছাড়া করি না কাহারে কুর্নিশ ।' শুধু তরুণদের নয় কিশোরদের মধ্যেও 'বিদ্রোহী' কবিতা আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল সেদিন । বিশিষ্ট সাহিত্যিক বুদ্ধদেব বসু তখন কিশোর । ওই বয়সে 'বিদ্রোহী' কবিতার অনুভূতি তাঁর এক স্মৃতিকথায় বলেছেন, '..'বিদ্রোহী' পড়লাম ছাপার অক্ষরে মাসিকপত্রে--মনে হল, এমন কখনো পড়িনি । অসহযোগের অগ্নিদীক্ষার পরে সমস্ত মন-প্রাণ যা কামনা করছিল, এ যেন তা-ই, দেশব্যাপী উদ্দীপনার এ-ই যেন বাণী ।' 
এই কবিতা যখন গুরুদেবকে নিজের কন্ঠে শুনিয়েছিলেন, তখন কবিগুরু নজরুলকে বলেছিলেন, "তুমি আমাকে নিশ্চয় অতিক্রম করে যাবে । তোমার কবিতা শুনে মুগ্ধ হয়ে গিয়েছি । আশীর্বাদ করি তোমার কবিপ্রতিভায় বিশ্বজগৎ আলোকিত হোক ।" কবিগুরু তখন সাহিত্য জগতে রবির আলোয় আলোকিত করছেন । শুধু বাংলা সাহিত্যে নয়, বিশ্ব সাহিত্যে ঢেউ তুলেছেন । বাংলা সাহিত্য জগতে নবাগতরা তাঁর ধারায় প্রবেশ করছে । ঠিক এই সময়ে নজরুল হাঁটা শুরু করলেন তাঁর নিজস্ব ধারায় । কবি অরুণ মিত্রের কথা অনুযায়ী বলতে হয়, 'রবীন্দ্রনাথের আলোকসামান্য প্রতিভার ছটায় যখন দেশবাসী মন্ত্রমুগ্ধ, তখন নজরুল হাঁটছেন তাঁর স্বতন্ত্র পথে রবীন্দ্র-পরিধির বাইরে । মনে হয় সে জন্যেই তিনি রবীন্দ্রনাথের কাছ থেকে এত স্নেহ পেয়েছেন ।' 
রবীন্দ্রনাথ নজরুলকে স্বয়ং স্নেহ করেছেন, কিন্তু তদানীন্তন সময়ে নজরুলের সাহিত্যের বিরোধিতা করেছেন রবীন্দ্র- অনুসারী অনুগামী কবি ও অন্যান্য লেখকগণ । 'বিদ্রোহী' কবিতার বিরুদ্ধে কবি মহিতলাল মজুমদার প্রচার করেছিলেন এই বলে যে নজরুল তাঁর 'আমি' কথিকার ভাবসম্পদ চুরি করে এই কবিতা লিখেছেন । যদিও তা প্রমাণিত হয়নি । এমনকি 'বিদ্রোহী' কবিতার ব্যঙ্গ করে লেখা হয়েছে 'ব্যাঙ' নামক কবিতা ( আমি ব্যাঙ/লম্বা আমার ঠ্যাং....) এবং তা ছাপা হয়েছে 'শনিবারের চিঠি' পত্রিকায় । এই কবিতার সূত্রেই কবি সজনীকান্ত দাস ও মোহিতলাল মজুমদার নজরুলের বিরোধিতায় মেতে উঠেছিলেন । শুধু তাই নয় 'শনিবারের চিঠি' পত্রিকা পুরোপুরি নজরুলের বিরুদ্ধে আক্রমণে মেতে উঠেছিল । কখনো তা শালীনতার সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছিল । একজন কবি বা লেখকের বিরুদ্ধে 'শনিবারের চিঠি' পত্রিকার মাধ্যমে একের পর এক সংগঠিত নগ্ন আক্রমণ মনে হয় বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে প্রথম কালো অধ্যায় ।  
আসলে 'বিদ্রোহী' কবিতা নজরুলকে খ্যাতির চূড়ায় পৌঁছে দিয়েছে তখনই । এ প্রসঙ্গে অধ্যাপক রবীন্দ্রনাথ গুপ্ত লিখেছেন, 'নজরুলের কবিতাটি যে একান্ত আত্মগত প্রেরণের ফল তা কাব্যরসিক মাত্র স্বীকার করবেন । নতুবা রবীন্দ্রপ্রতিতা যখন মধ্যাহ্নদীপ্তিতে বিরাজমান তখনই নজরুলের আকস্মিক আবির্ভাব দল গোষ্ঠী নির্বিশেষে এমন সংবর্ধিত হত না ।' আর এই খ্যাতিই হয়তো তাঁর প্রতি একশ্রেণীর বিরুদ্ধাচরণের একটা কারণ হতে পারে । 
অবশ্য পরবর্তীকালে কবি সজনীকান্ত দাশ নজরুলের লেখার গুণগ্রাহী হয়ে উঠেছিলেন । তিনি লিখেছেন, 'রবীন্দ্রযুগেও কবি নজরুল ইসলাম বাঙালি সমাজে প্রতিষ্ঠা লাভ করিতে পারিয়াছিলেন বিদ্রোহের কবি হিসাবে--এই বিদ্রোহ প্রধানত বর্তমান রাজনৈতিক শৃঙ্খল ও বন্ধনের বিরুদ্ধে ।...বাংলাদেশের মত অনড় ও জড় দেশকে জাগাইবার জন্য যে আবেগময় উচ্ছ্বসিত প্রাণবন্যার প্রয়োজন ছিল কবি নজরুলের মধ্যে তাহার প্রকাশ ঘটিয়াছিল ।' নজরুলের কবিতা সম্পর্কে কবি অরুণ মিত্রের স্মৃতির কথা আর একবার বলতে হয় । তিনি বলছেন, ' আমার জীবন যখন আসন্ন রাত্রির সামনে তখন, আমার এই বয়সেও, কাজী নজরুল ইসলামের কবিতা পড়তে গেলে আমি যৌবনে প্লাবিত হই । আমার স্মৃতির জাগরণ ঘটে । তরুণ বয়সী শ্রোতা আমি, শুনছি কলকাতার অ্যালবার্ট হল মঞ্চে কবির স্বকন্ঠের আবৃত্তি তাঁরই রচিত বিখ্যাত কবিতা 'বিদ্রোহী' । নজরুলের আয়ত চোখের ঔজ্জ্বল্য, কন্ঠস্বরের প্রবলতা
, দৃপ্ত দেহভঙ্গি আজও আমার দৃষ্টির সামনে ফুটে ওঠে ।..তাঁর কবিতা যখন এই বয়সে পড়ি, তার উচ্ছলতা আমার মধ্যে সঞ্চারিত হয় ।' 'বিদ্রোহী' কবিতা সেই উচ্ছলতার উৎস । ডঃ সুশীল গুপ্ত বলেছেন,'.. বাংলাসাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সিম্বলিক কবিতা 'বিদ্রোহী' । নজরুলের এই সার্থক সিম্বলিকের মূলে কাজ করেছে তাঁর অপ্রতিহত দুর্দান্ত, পৌরুষ, উদ্দাম, উন্মুক্ত হৃদয়াবেগ এবং বীর্যবন্ত চির উন্নতশির অহমিকা ।' তাঁর চির উন্নতশিরের অহমিকা কি আজও সিম্বলিক হয়ে আছে ? তিনি তাঁর 'বিদ্রোহী' কবিতায় সেই উন্নতশিরে বিদ্রোহকে শান্ত করতে চেয়ে বলেছিলেন, 'যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন-রোল, আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না/ অত্যাচারীর খড়্গ কৃপাণ ভীম রণ-ভূমে রণিবে না-/ বিদ্রোহী রণ ক্লান্ত/ আমি সেই দিন হব শান্ত !' আজ উৎপীড়িতের ক্রন্দন-রোল একশো বছর পরে শেষ হয়েছে কি ? অত্যাচারী এখন কি আর নেই ও তার খড়্গ কৃপাণ আর হাতে নেই? আসলে একশো বছর আগে নজরুলের দেখা অত্যাচারী এখন আর নেই, সময়ের অভিযোজনে রূপের অনেক বদল ঘটেছে তাদের । তাই বাংলা সাহিত্যে নজরুলের 'বিদ্রোহী' কবিতা ডঃ গুপ্ত'র কথা অনুযায়ী শুধু সিম্বলিক নয়, বিদ্রোহ যা কিছু নজরুলের তা ও কি আজও শুধুই সিম্বলিক !  

ঋণঃ--
1. কাজী নজরুল ইসলাম জন্মশতবর্ষ স্মারক গ্রন্থ -- পঃ বঃ বাংলা একাডেমী 
2. চির উন্নত শির -- সারা বাংলা নজরুল শতবর্ষ কমিটি
3. শতবর্ষের আলোকে নজরুল-- সম্পাদনায় দেবেশ্বর ভট্টাচার্য 
4. বাঁশি আর রণতুর্য-- সম্পাদনায় বাহারউদ্দিন 
ads banner


ads banner

Bangla eDaily to resume soon



Tags: